গত ৯ বছরে সবচেয়ে কম পাসের হার ।

গত ৯ বছরে সবচেয়ে কম পাসের হার

0
79

গত নয় বছরের ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০১০ সালে পাসের হার ছিল ৭৮.১৯ শতাংশ, ২০১১ সালে পাসের হার ৮২.১৬ শতাংশ, ২০১২ সালে পাসের হার ৮৬.৩২ শতাংশ, ২০১৩ সালে পাসের হার ৮৯.২৮ শতাংশ, ২০১৪ সালে ৯২.৬৭ শতাংশ, ২০১৫ সালে পাসের হার ৮৬.৭২ শতাংশ, ২০১৬ সালে পাসের হার ৮৮.৭০ শতাংশ। আর ২০১৭ সালে পাসের হার ছিল ৮০.৩৫ শতাংশ। যা আগের বছরগুলোর তুলনায় কিছুটা কম। তবে এ বছর ফলাফল সবচেয়ে খারাপ হয়েছে। এবার পাসের হার এসে দাঁড়িয়েছে ৭৭.৭৭ শতাংশ।
গত নয় বছরের মধ্যে এবারই পাসের হার সবচেয়ে কম হওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ বলেন, ‘পাসের হার কমার কারণ হচ্ছে আমরা মূল্যায়নের দিকটা পরিবর্তন করেছি। আমাদের ফলাফলে সমতা আনার জন্য, শিক্ষকদের ভালোভাবে খাতা দেখতে বলা হয়েছে। মনোযোগ দিয়ে খাতা দেখার ফলে হয়তো আগের চেয়ে ফলাফল কমেছে।’

মাধ্যমিক ও সমমানের পরীক্ষায় গত নয় বছরের মধ্যে এবারই সবচেয়ে খারাপ ফলাফল হয়েছে। এ বছর ১০টি শিক্ষা বোর্ডে পাসের হার ৭৭ দশমিক ৭৭ শতাংশ। তিন কারণে এবার ফল বিপর্যয় হয়েছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।
তিন কারণের মধ্যে রয়েছে- পরীক্ষার খাতা দেখায় কড়াকড়ি আরোপ, মানবিক বিভাগের ছাত্র-ছাত্রীদের অকৃতকার্য হওয়ার সংখ্যা বৃদ্ধি, আর সিলেট শিক্ষা বোর্ডে গড়ে খারাপ ফলাফল।

এবারের ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বিজ্ঞান বিভাগে পাসের হার ৯৩.০৭ শতাংশ, গত বছর ছিল ৯৩.৩৫ শতাংশ। মানবিক বিভাগে এবার পাসের হার ছিল ৬৯.০০ শতাংশ, গত বছর ছিল ৭৩.৩৮ শতাংশ। ব্যবসায় শিক্ষায় এবার পাসের হার ছিল ৮০.৯১ শতাংশ, গত বছর ছিল ৮০.২১ শতাংশ।
এ বছর সিলেটে সবচেয়ে বেশি খারাপ ফল হয়েছে। বোর্ডটিতে পাসের হার ৭০ দশমিক ৪২ শতাংশ। যা গত বছর ছিল ৮০.২৬ শতাংশ।

শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ‘আরেকটা কারণ হচ্ছে- আমাদের শিক্ষার মান কিন্তু বৃদ্ধি পেয়েছে। এ কারণে খাতা দেখার ক্ষেত্রে কড়াকড়ি আরোপ করা হচ্ছে। সবকিছু মিলিয়ে হয়তো পাসের হার কমছে।’
যদিও এবার মাধ্যমিকে পরীক্ষার্থীর সংখ্যা বেশি হওয়ায় সন্তোষ প্রকাশ করেছেন শিক্ষামন্ত্রী।
তিনি বলেন, ‘আমাদের কিন্তু শিক্ষার্থী সংখ্যা বাড়ছে। ঝরে পরা কমছে। আগে ছিল কিছু লোকের জন্য শিক্ষা। এখন সবার জন্য শিক্ষা। পাসের হার কমলেও শিক্ষার মান বৃদ্ধি পাচ্ছে। স্কুলমুখী করে ছাত্র-ছাত্রীদের স্কুলে ধরে রাখাই বড় অর্জন।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক পদস্থ কর্মকর্তা বলেন, ‘শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে সব বোর্ডের খাতা কড়াকড়ি করে দেখার বিষয়ে একটা নির্দেশনা ছিল। যে কারণে শিক্ষকরা বাড়তি মনোযোগ দিয়ে খাতা দেখেছে। আরেকটি কারণ হচ্ছে মানবিকে ফলাফল তুলনামূলক খারাপ হয়েছে। সিলেটের খারাপ ফলের প্রভাবও সার্বিক ফলাফলে পড়েছে।’
এবার সারাদেশে এবার জিপিএ-৫ পেয়েছে এক লাখ ১০ হাজার ৬২৯ জন। গত বছর জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল এক লাখ চার হাজার ৭৬১ জন। বেড়েছে পাঁচ হাজার ৮৬৮ জন।
গত বছরের তুলনায় এ বছর বিজ্ঞান শাখায় পরীক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়েছে ৮১ হাজার ৩৫১ জন। এবং গতবারের চেয়ে পাসও বেশি করেছে ৭৪ হাজার ৫৩০ জন। এ শাখায় জিপিএ-৫-এর সংখ্যা গত বছরের তুলনায় পাঁচ হাজার ৭৪২ জন বৃদ্ধি পেয়েছে। শিক্ষামন্ত্রী বিজ্ঞান বিভাগের সংখ্যা ও জিপিএ-৫ বৃদ্ধি পাওয়ার সংখ্যা উল্লেখ করে একে এবারের সবচেয়ে ভালো সংবাদ বলে বর্ণনা করেছেন।
এ ছাড়া শতকরা পাস করা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা কমেছে। কিন্তু বেড়েছে শূন্য পাস করা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা। এবার সারাদেশে শতভাগ পাস করা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা এক হাজার ৫৭৪টি। যা গত বছর ছিল দুই হাজার ২৬৬টি। কমেছে ৬৯২টি।
রোববার দুপুর একটায় শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ সাংবাদিকদের ব্রিফ করে পরীক্ষার তথ্য জানান। এর আগে সকাল ১০টায় শিক্ষামন্ত্রী এ বছরের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফলাফলের সারসংক্ষেপ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাতে তুলে দেন। পরে ১০টি শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান পৃথকভাবে স্ব স্ব শিক্ষা বোর্ডের ফলাফলের কপি প্রধানমন্ত্রীর কাছে হস্তান্তর করেন।
এ সময় ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে বরিশাল এবং বান্দরবান জেলা সংযুক্ত ছিল। প্রধানমন্ত্রী পরে জেলা দুটির শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। এ সময় তিনি শিক্ষার্থীদের সোনার বাংলা গড়ার জন্য পড়াশোনায় মনোযোগী হওয়ার আহ্বান জানান।
বোর্ডভিত্তিক ফলাফল: এসএসসি পরীক্ষার বোর্ডভিত্তিক ফল থেকে দেখা গেছে, কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডে গতবারের চেয়ে রেকর্ড ২১ দশমিক ৩৭ শতাংশ বেশি পাস করেছে। গতবার এ বোর্ডে পাস করে মাত্র ৫৯ দশমিক শূন্য তিন শতাংশ। কিন্তু এবার সেখানে পাস করেছে ৮০ দশমিক ৪০ শতাংশ। যা তৃতীয় সর্বোচ্চ।
সারাদেশে প্রথম স্থান অধিকার করেছে রাজশাহী বোর্ড। এ বোর্ডে পাসের হার ৮৬ দশমিক শূন্য ৭ শতাংশ। গতবার এখানে পাসের হার ছিল ৯০ দশমিক ৭০ শতাংশ। এবার কমেছে ৪ দশমিক ৬৩ শতাংশ।
দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে, ঢাকা শিক্ষা বোর্ড। এ বোর্ডে পাসের হার ৮১ দশমিক ৪৮ শতাংশ। গতবার যা ছিল ৮৬ দশমিক ৩৯ শতাংশ। হার কমেছে ৪ দশমিক ৯১ শতাংশ।
তৃতীয় অবস্থানে থাকা কুমিল্লার পরেই রয়েছে দিনাজপুর শিক্ষা বোর্ড। এ বোর্ডে পাসের হার ৭৭ দশমিক ৬২ শতাংশ। যা গতবার ছিল ৮৩ দশমিক ৯৮ শতাংশ।
পঞ্চম অবস্থানে রয়েছে বরিশাল শিক্ষা বোর্ড। এখানে পাসের হার ৭৭ দশমিক ১১ শতাংশ। গতবার যা ছিল ৭৭ দশমিক ২৪ শতাংশ। এখানেও কমেছে শূন্য দশমিক ১৩ শতাংশ।
ষষ্ঠ স্থানে রয়েছে যশোর বোর্ড। এ বোর্ডে পাসের হার ৭৬ দশমিক ৬৪ শতাংশ। গতবার এটি ছিল ৮০ দশমিক শূন্য চার শতাংশ। পাসের হার কমেছে ৩ দশমিক ৪ শতাংশ।
চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের অবস্থান সপ্তম। এ বোর্ডে পাসের হার ৭৫ দশমিক ৫০ শতাংশ। গতবার এ বোর্ডে পাসের হার ছিল ৮৩ দশমিক ৯৯ শতাংশ। এখানেও পাসের হার হ্রাস পেয়েছে ৮ দশমিক ৪৯ শতাংশ।
কারিগরি শিক্ষা বোর্ড রয়েছে অষ্টম স্থানে। এখানে পাস করেছে ৭১ দশমিক ৯৬ শতাংশ। গতবার এ বোর্ডের পাসের হার ছিল ৭৮ দশমিক ৬৯ শতাংশ। হ্রাস পেয়েছে ৬ দশমিক ৭৩ শতাংশ।
নবম স্থানে মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড। যেখানে পাসের হার ৭০ দশমিক ৮৯ শতাংশ। গতবার মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডে পাসের হার ছিল ৭৬ দশমিক ২০ শতাংশ। এ বোর্ডে পাসের হার গতবারের চেয়ে কমেছে ৫ দশমিক ৩১ শতাংশ।
আর বোর্ডভিত্তিক ফলাফলে সবার পেছনে রয়েছে সিলেট বোর্ড। এ বোর্ডে এবার পাসের হার ৭০ দশমিক ৪২ শতাংশ। গতবারের চেয়ে যা ৯ দশমিক ৮৪ শতাংশ কম। গতবার এ বোর্ডে পাসের হার ছিল ৮০ দশমিক ২৬ শতাংশ। এক বছরের ব্যবধানে সবচেয়ে খারাপ ফলও করেছে এ বোর্ডই।

এক প্রশ্নের জবাবে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ‘কিছু বিষয় আছে যেটা পরবর্তীকালে সঠিক তথ্য দিয়ে আমাদের বের করতে হবে। বোর্ডগুলো অবশ্যই এসব বিশ্লেষণ করবে। আমরাও করব। সার্বিকভাবে মূল্যায়ন করে হয়তো পাসের হার কমার কারণগুলো বলা যাবে।’
বাংলাদেশ পরীক্ষা উন্নয়ন ইউনিট (বিইডিইউ) কয়েক বছর গবেষণা করে পাবলিক পরীক্ষার উত্তরপত্র মূল্যায়নে নতুন কাঠামো নির্ধারণ করে দিয়েছে।
পাসের হার কমার ক্ষেত্রে প্রশ্নফাঁসের কোনো প্রভাব পড়েছে কিনা, এমন প্রশ্নের জবাবে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ‘প্রশ্নফাঁসের কোনো প্রভাব পড়েনি। মূল্যায়নে সমতা আনার কারণে এমনটি হয়েছে। এ ছাড়া বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়ার জন্য পরীক্ষার খাতা সঠিকভাবে মূল্যায়ন করা হয়েছে।’
অপর এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, ‘এমসিকিউতে তুলনামূলক পাসের কার কম। যদিও এ বছরের হিসাবটা এখন নেই। তবে আগে আমাদের ফলাফল মূল্যায়নে আমরা দেখেছি এমসিকিউতেই ফলাফল তুলনামূলক খারাপ হয়। বর্ণনামূলকে তুলনামূলক ভালো হয়।’
সিলেটে কেন ফল বিপর্যয় হলো, এমন প্রশ্নের জবাবে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ‘এটা আসলে এখনই বলা যাবে না। সার্বিকভাবে ফলাফল মূল্যায়নের পর সুনির্দিষ্ট কারণ বলা যাবে।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান জিয়াউল হক বলেন, ‘সার্বিকভাবে ফলাফল খারাপ হয়েছে। তবে শিক্ষার মান কিন্তু ভালো হচ্ছে। তবে এখনই সুনির্দিষ্ট কোনো কারণ বলা যাচ্ছে না। এটা বলতে সময় লাগবে।’

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here